বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন তরুণ-তরুণীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে জুয়েলারী তৈরি প্রশিক্ষণ (১১-১৮ আগস্ট ২০২৫)
December 29, 2025
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন তরুণ-তরুণীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে জুয়েলারী তৈরি প্রশিক্ষণ (১১-১৮ আগস্ট ২০২৫)

প্রশিক্ষণ প্রতিবেদন

সার-সংক্ষেপঃ

ইন্সপিরেশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি (আইডব্লিউএস)-এর আয়োজনে এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায়  ১১–১৮ আগস্ট ২০২৫, সাত দিন ব্যাপী ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন তরুণ-তরুণীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে জুয়েলারি তৈরির প্রশিক্ষণ’ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ৩৩ জন অংশগ্রহণকারী (১৬ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন  তরুণ-তরুণী ও তাঁদের ১৭ জন মা) প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন। তাঁদেরকে জুয়েলারি তৈরির মৌলিক ধারণা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, উপকরণ ব্যবহার, ডিজাইন, বিডিং ও আপ-সাইকেল পদ্ধতির মাধ্যমে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। প্রশিক্ষণ শেষে প্রদর্শনীতে তাঁদের তৈরি পণ্য উপস্থাপন করা হয়। কর্মসূচিটি অংশগ্রহণকারীদের আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা ও উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা বৃদ্ধি করেছে। এসএমই ফাউন্ডেশন তাঁদের জন্য ভবিষ্যতে ফটোগ্রাফি, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন ও হস্তশিল্প প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা নিয়েছে এবং ১২তম এসএমই পণ্য মেলায় স্টল বরাদ্দের মাধ্যমে বাজারে প্রবেশের সুযোগ প্রদান করবে।

 

১. ভূমিকা

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন তরুণ-তরুণীরা যাতে সমাজে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে, সেলক্ষ্যে এসএমই ফাউন্ডেশনকে সাথে নিয়ে ইন্সপিরেশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটিক উদ্যোক্তা তৈরির বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে। এলক্ষ্যে এসএমই ফাউন্ডেশন, ইন্সপিরেশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি আয়োজিত এই প্রশিক্ষণ কর্মসুচিকে সার্থক করতে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে। উল্লেখ্য এসএমই ফাউন্ডেশন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে দীর্ঘদিন ধরে সরকারীভাবে কাজ করছে।

 

২. প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য

  • বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন তরুণ-তরুণীদের উদ্যোক্তা হিসেবে প্রস্তুত করা।
  • দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।
  • পরিবার ও সমাজে আত্মনির্ভরশীল করে তোলা।
  • সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও সম্মানজনক জীবনযাপনের পথ সুগম করা।

 

৩. অংশগ্রহণকারীর প্রোফাইল

মোট অংশগ্রহণকারী: ৩৩ জন ( বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন তরুণ-তরুণী ১৬ জন, তাঁদের মা  ১৭ জন)

লিঙ্গভিত্তিক বণ্টন: নারী ২৯ জন, পুরুষ ৪ জন

প্রতিবন্ধিতার ধরন: অটিজম, বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা, ডাউন সিনড্রোম, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা।

 

৪. প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু

  • জুয়েলারি শিল্পের পরিচিতি
  • নিরাপদ কাজের পরিবেশ
  • সরঞ্জাম ব্যবহার
  • কানের দুল, বিভিন্ন রকমের ও সাইজের মালা, ফেলত এর কাজ, চুড়ি, ব্রেসলেট, ব্রোচ, হেড ব্যান্ড,  পায়েল, ফিঙ্গার রিং, টিকলি, নাকফুল, কাঁকন, কেশসজ্জার বিডস পিন, কী-রিং ইত্যাদি তৈরির কৌশল
  • লুম ব্যবহার করে অর্নামেন্ট তৈরির কৌশল।
  • বিডিং ও আপ-সাইকেল পদ্ধতিতে জুয়েলারি তৈরি
  • রঙের ব্যবহার ও নান্দনিকতা
  • কস্টিং, এমআরপি ও বিপণণ এর প্রাথমক ধারণা

 

৫. কার্যক্রম ও বিশেষ উদ্যোগ

  • অংশগ্রহণকারীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ
  • অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা
  • সমাপনী প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারীদের তৈরি পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রয়
  • অংশগ্রহণকারীদের মতামত ও প্রত্যাশা যাচাই
  • অংশগ্রহণকারী বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন তরুণ-তরুণীদের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতার গল্পের সাথে পরিচিতকরণ।

 

৬. অতিথি পরিচিতি

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান-

জনাব মো: আব্দুস সালাম সরদার, মহাব্যবস্থাপক, এসএমই ফাউন্ডেশন

জনাব আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এসএমই ফাউন্ডেশন

জনাব জনাব ইলিয়াস হোসাইন , সহ সভাপতি, IWS
জনাব শাহেদুল ইসলাম হেলাল, বেঙ্গল ব্রেইডেড রাগস্ লিঃ

জনাব আব্দুল নূর তুষার, গণমাধ্যম কর্মী
মিজ কানিজ সুবর্ণা, কণ্ঠশিল্পী
জনাব মুকিত জাকারিয়া অভিনয়শিল্পী

 

সমাপনী অনুষ্ঠান-

জনাব মো. মুশফিকুর রহমান, চেয়ারপারসন, এসএমই ফাউন্ডেশন

মিজ ফারজানা খান, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, এসএমই ফাউন্ডেশন

জনাব শাহেদুল ইসলাম হেলাল, স্বত্বাধিকারী, বেনীবুনন

ফারিয়া কবীর, হেড অব কর্পোরেট, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক

দেওয়ান শামসুর রকিব, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট,  আইডব্লিউএস

মুনমুন আহমেদ, বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী

হায়দার হোসেন, বিশিষ্ট কন্ঠশিল্পী

ডাঃ এজাজুল ইসলাম, বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব

জনাব এ এস এম সাইফুল ইসলাম, ই ভি পি, এইচ এস বি সি ব্যাংক

জনাব মশিউর রহমান, ই ভি পি, ঢাকা ব্যাংক

জনাব কাজি মুহিত, হেড অব ফিন্যান্স, একাউন্টস এন্ড মার্কেটিং, পলমল গ্রুপ

 

৭. অতিথিদের বক্তৃতা ও মতামত

১. জনাব মো. মুশফিকুর রহমান, চেয়ারপারসন, এসএমই ফাউন্ডেশন

“এসএমই ফাউন্ডেশন বিশ্বাস করে, এই প্রশিক্ষণ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন তরুণ-তরুণীদের প্রতিভাকে আরও সৃজনশীল করার মাধ্যমে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে আত্মবিশ্বাসী করবে। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁরা ঘরে বসে হস্তশিল্পের মাধ্যমে আয় করতে পারবেন। ফলে সমাজে তাঁদের অন্তর্ভুক্তি ও সম্মানজনক জীবনের পথ সহজ হবে।”

২. জনাব মো: আব্দুস সালাম সরদার, মহাব্যবস্থাপক, এসএমই ফাউন্ডেশন

“এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন তরুণদের এমন দক্ষতা অর্জন করানো যা তাদেরকে স্বনির্ভর উদ্যোক্তা হিসেবে নিজস্ব কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে সক্ষম করবে।”

৩.মিজ ফারজানা খান, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক , এসএমই ফাউন্ডেশন

“এই প্রশিক্ষণ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন তরুণ-তরুণীদের প্রতিভাকে সৃজনশীল করবে এবং উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে। তাঁরা হস্তশিল্পের মাধ্যমে ঘরে বসে আয় করতে সক্ষম হবেন।”

৪. সৈয়দা মুনিরা ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক, ইন্সপিরেশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি (IWS)

“আমাদের সংস্থা ২০১৫ সালে শুরু হয়েছিল, যারা খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত ব্যক্তিদের সহায়তা করতে এবং তাদের অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিয়েছে।”

 

৫. জনাব আনোয়ার হোসাইন চৌধুরী, মহাব্যবস্থাপক, এসএমই ফাউন্ডেশন

“আমরা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন তরুণদের তৈরি পণ্যের জন্য একটি বাজার তৈরি করতে সহায়তা করছি। SDG লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, কেউ পিছিয়ে থাকা উচিত নয়। এই শিশুরা সমাজের প্রান্তিক স্তরে অবস্থান করছে এবং আমরা তাদের দক্ষতা প্রদর্শন এবং উন্নত করার চেষ্টা করছি।”

৬. জনাব ইলিয়াস হোসাইন, ভাইস প্রেসিডেন্ট, IWS

“আমাদের শিশুরা শুধুমাত্র প্রতিবন্ধী নয়; তারা বিশেষ প্রতিভার অধিকারী। প্রকৃত সমস্যা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনায়। রাষ্ট্র যদি সঠিকভাবে পরিচালনা করতো, আমাদের শিশুরা আরও প্রতিষ্ঠিত হতে পারত এবং একটি সহায়ক পরিবেশে জীবন যাপন করতে পারত।”

৭. জনাব আব্দুল নূর তুষার, মিডিয়া পেশাজীবী

“প্রতিবন্ধী শিশুদের আচরণগত পার্থক্য কোনো রোগ নয়; এটি স্বাভাবিকতা। সমাজ সম্মিলনের জন্য চাহিদা তৈরি করেছে, কিন্তু এই শিশুরা অনন্য এবং বিশেষ গুণাবলীর অধিকারী। এরা বিশেষ গুনসম্পন্ন শিশু”

৮.  কানিজ সুবর্ণা, গায়িকা

“দুইজন বক্তৃতা প্রতিবন্ধী সন্তানের মা হিসেবে, আমি প্রতিদিন বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হই। তবুও, আমি সবদিক দিয়ে তাদের সহায়তা করার চেষ্টা করি। প্রতিভার সঙ্গে প্রায়ই চ্যালেঞ্জ আসে এবং আমরা প্রতিদিন সেগুলো অতিক্রম করি।”

৯. জনাব মুকিত জাকারিয়া, অভিনেতা

“প্রতিবন্ধী শিশুর পিতামাতারা বহু প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। তাদেরকে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করা প্রয়োজন, যাতে তারা তাদের সন্তানদের সঠিকভাবে পালনপোষণ করতে সক্ষম হন।”

১০. জনাব ডাঃ এজাজুল ইসলাম, বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব

“বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য রাষ্ট্র, কর্পোরেট গ্রুপ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। তাদের জন্য ভাতা, স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার টেকসই কাঠামো তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।”

 

৮. ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাঃ

এসএমই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে।

  • উন্নত প্রশিক্ষণ: ফটোগ্রাফি, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন, হস্তশিল্প।
  • বাজারে প্রবেশ: ১২তম এসএমই পণ্য মেলায় স্টল বরাদ্দ।
  • পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ সাপোর্ট প্রদান।

 

 

৯. প্রভাব ও অর্জন (Impact & Outcomes)

  • দক্ষতা বৃদ্ধি: মৌলিক জুয়েলারি তৈরি দক্ষতা অর্জন।
  • আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি: প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ তাঁদের দৃশ্যমান সাফল্য দিয়েছে।
  • পারিবারিক সমর্থন: মা-বাবার সম্পৃক্ততা টেকসই উন্নয়নকে সহজ করবে।
  • সামাজিক স্বীকৃতি: অংশগ্রহণকারীদের সমাজে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে।
  • উদ্যোক্তা হওয়ার প্রস্তুতি: ভবিষ্যৎ বাজারজাত ও ডিজিটাল প্রশিক্ষণ তাঁদের উদ্যোক্তা হওয়ার বাস্তব পথে নিয়ে যাবে।

 

১০. টেকসই দিক (Sustainability)

  • পরিবারের সদস্যরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হওয়ায় ঘরে বসে অনুশীলন অব্যাহত থাকবে।
  • এসএমই ফাউন্ডেশনের চলমান কর্মসূচির আওতায় সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
  • পণ্য বিক্রয়ের সুযোগ টেকসই আয়ের পথ নিশ্চিত করবে।

 

১১. সুপারিশ (Recommendations)

  • প্রশিক্ষণের সময়কাল ও প্রশিক্ষক এর সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন।
  • পর্যাপ্ত ও উন্নত মানের সরঞ্জাম ও কাঁচামাল বা উপকরন সরবরাহ।
  • নিয়মিত ফলো-আপ ও মেন্টরশিপ ব্যবস্থা।
  • স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ।
  • স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেলস নিশ্চিতে কর্মপরিকল্পনা গ্রহন।
  • স্বল্পসুদে ঋণ ও প্রণোদনা সুবিধা প্রদান।

 

১২. উপসংহারঃ সামগ্রিকভাবে ইন্সপিরে শন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি (আইডব্লিউএস) আয়োজিত এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য একটি কার্যকর মডেল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে যা তাঁদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে উৎসাহিত করেছে ।